১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়। বাংলা ভূখণ্ড খণ্ড-বিখন্ড হয়ে পড়ে। ১৯১১ সালে পুনর্গঠনের পর যে বাংলা-রাজ্য গঠিত হয়েছিল তার ৬২ শতাংশ নিয়ে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান, যা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পরিণত হয়। বাকি ৩৮ শতাংশ নিয়ে গঠিত হয় ভারতের পশ্চিম বঙ্গরাজ্য। সিলেটি জেলার বেশিরভাগ অংশ পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। করিমগঞ্জ সমেত খানিকটা যুক্ত হয় ভারত বর্ষের আসাম রাজ্যের সঙ্গে। বাংলাভাষী-অধ্যুষিত বরাক উপত্যকা এবং গোয়াল পাড়া প্রভৃতি জেলা আসামের মধ্যে থাকে। পশ্চিমের অনেকটা এলাকা বিহারের মধ্যে থাকে। ভারত বিভাগের পূর্বে ভাষিক গোষ্ঠী হিসেবে বাংলাভাষিরা ছিল সংখ্যায় সব থেকে বেশি। ১৯১১ সালের আদমশুমারিতে ৮,৮৩,৬৭,৯১৫ জন ভারতবাসী বাংলাকে তাঁদের মাতৃভাষা বলেছিল। ৪,১০,৫০ ,০০০ লোক হিন্দিকে নিজেদের মাতৃভাষা বলেছিল। সে অনুসারে সংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষীরা ছিল ভারতবর্ষের বৃহত্তম গোষ্ঠী এবং সারা পৃথিবীতে উত্তর চীন, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, জার্মান, স্পেনীয়, জাপানী ভাষাভাষীদের পরেই তাদের অবস্থান ছিল। কিন্তু দেশ বিভাগের পর কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারগুলি যে ভাষা-নীতি অনুসরন করতে তাকে তার ফলে বাংলাভাষীদের সংখ্যা তুলনায় কমতে থাকে। হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা এবং দেশ বিভাগের ফলে ভাষিক গোষ্ঠী হিসেবে বাংলাভাষীদের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা আর অন্য কোন ভাষিক গোষ্ঠীর হয়নি।
সম্মানিত পাঠক, মাফ করবেন। আজকের প্রসঙ্গ, “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” নিয়ে লেখা হলেও তার প্রেক্ষাপট অধুনাও বিশাল। এখানে বলা বাহুল্য যে, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুভাষীক গোষ্ঠী, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ওপর জোর করে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে তৎকালীন বাঙালিরা রুখে দাঁড়ায়। তার ফলে একটি তীব্র আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রজনতার ওপর গুলি চালানো হলে বরকত, রফিক, সালাম, জব্বার, শফিউর রহমানসহ আরও অনেকে শহীদ হন। এর তাৎক্ষণিক ফল ছিল পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি; আর দীর্ঘমেয়াদি ও চূড়ান্ত পরিণতিতে ভাষা-আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করেই জন্ম নেয় স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র।মাতৃভাষার জন্য এই ত্যাগও আত্মদানের কথা মনে রেখেই “১৯৯৯ সালের রাষ্ট্রসংঘ বাংলাদেশের একুশে ফেব্রুয়ারিকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে ঘোষণা করে।”
এখানে বর্ণনা করা যেতে পারে যে, এই সুদীর্ঘকালে অনেক গঠন, অঘটন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ,উত্থান-পতন ঘটলেও, সভ্যতার অগ্রযাত্রা মুহুর্তের জন্যেও থেমে থাকেনি। তর তর করে পৃথিবী এগিয়েছে নিঃসন্দেহে অনেকখানি। কিন্তু, সে তুলনায় আমাদের মাতৃভাষা বাংলা কতটুকু এগিয়েছে? মোটকথা, ১৯৫২ সালের পর বাংলা ভাষা এদেশের জন্য রাষ্ট্রভাষা রূপে স্বীকৃতি পেলেও, মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য বাংলা ভাষা শত্রু-মুক্ত হতে পারলো না। বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানি ভাষা বানানোর ষড়যন্ত্র অব্যাহতই থাকলো। আর বর্তমানে তো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলা ভাষা লেঙড়া খোঁড়া হতে-হতে তার নিজস্ব সত্তা হারাতে বসেছে।পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা বাংলা, উর্দুর সমান গুরুত্ব পায়নি এবং তা নিশ্চিত করার জন্য আজীজ আহমদরা লেখেন, ….‘নিশ্চয়ই উর্দু একটি সাধারণ বন্ধন সূত্র’। নিশ্চয় যে উর্দু এ অঞ্চলের সাধারণের জন্য বন্ধন-সূত্র হতে পারে না, তেমন কথা ভুলেও সে সময় উচ্চারণ করেনি। যদিও এ নেক্কারজনক কাজগুলো এদেশের পণ্ডিতজনেরাই নিজেদের আখের ঘুচানোর জন্য কলের পুতুলের মত করে গেছেন। তাঁরা বলতে পারেন নি যে, উর্দু সাধারণ বন্ধন-সূত্র হলেও, তা কেবল পশ্চিম পাকিস্তানের বিশেষ অঞ্চলের বিশেষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কেননা, বৃহত্তর পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ তাঁদের নিজস্ব মাতৃভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতেন। যেমন— পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বাংলায় কথা বলতেন। তবু ভাষানীতির ক্ষেত্রে একতরফা উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট ছিল।
১৯৫৩ সালে ইবরাহীম খাঁ প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদ সাহেব মাঝে মাঝে উর্দু বলেন; ‘বাংলার শরীফরাই উর্দু জানে’— এ কথা বললে তিনি খুশি হন। শিক্ষা সচিব এফ. এ. করিম বারবার তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যেক স্কুলে উর্দু শিক্ষাদান বাধ্যতামূলক করার জন্য রাজি করান। প্রস্তাবটি বোর্ডে এলে বোর্ড জানায়, পশ্চিম পাকিস্তানের স্কুলগুলোতে আগে বাংলা পাঠ বাধ্যতামূলক করা হোক; এরপর আমরা এখানেও উর্দু শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করব।”
উল্লেখ্য, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইবরাহীম খাঁ।
প্রাচীন ধর্ম গ্রন্থাদি পাঠে “বঙ্গ” নামীয় দেশের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীন “বঙ্গ” নাম থেকেই বর্তমান বাংলাদেশ নামটি এসেছে। সেই হিসেবে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে প্রাচীনতম একটি দেশ এবং তার জনবসতি আরো সুপ্রাচীন। সেই জনগণের মুখে নিশ্চিতই ভাষা ছিল, কিন্তু সে সময় ভাষাকে স্থায়ীভাবে বাঁচিয়ে রাখার তেমন ব্যবস্থা ছিল না। কাল ক্রমে মধ্যযুগে এসে পৃথিবীতে মানুষের মুখের ভাষা স্থায়িত্ব লাভ করে। একতা সকলেই জানে যে, ভাষার প্রথম প্রকাশ ঘটে মানুষের মুখে, মানুষের বাগযন্ত্রে। মানুষের বাগযন্ত্রই ভাষার প্রথম জন্মভূমি। বর্ণ বা অক্ষরের আবিষ্কার হয়েছে অনেক পরে। বর্ণ বা অক্ষর আসে লিখিত রূপের মধ্য দিয়ে সেই মুখের ভাষাকে স্থায়িত্ব দেবার জন্য এবং দূরের মানুষকে মনের কথা নিবেদন করার জন্য। বর্ণ বা অক্ষর আবিষ্কার মানুষের ইতিহাসের একটি আবিষ্কারণী ঘটনা।
মাতৃভাষা সম্পর্কিত সর্বজন স্বীকৃত যে, “মাছে ভাতে বাঙালি” হলেও একই সঙ্গে মিশে গেছে ফাল্গুন বা একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মা উৎসর্গের বা আত্মচেতনার প্রবাহটি। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির ভাষা-চেতনা, প্রকৃত জাতি চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই এ জাতি শিখেছে “ বাঙালি বাংলাদেশে জন্মেছে বলেই যে বাঙালি তা নয়। বাংলা ভাষার ভিতর দিয়ে মানুষের চিত্তলোকে যাতায়াতের বিশেষ অধিকার পেয়েছে বলেই সে বাঙালি।” বাঙালির জাতিসত্তার অন্যান্য জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের “ বিদ্রোহী” কবিতাটি কবি হৃদয়ের পুঞ্জীভূত বেদনার এক সংজ্ঞাহীন অভিব্যক্তি। এটি ছিল দেশ ও জাতির জন্য কবি’র যুগোপযোগী এক শাশ্বত উপহার। নিপীড়িত, বঞ্চিত শোসিত দেশবাসীর মুক্তিই ছিল কবি’র বিদ্রোহের মূল সুর। আগামী দিনের জাতির জন্য এমন দিন আসা অস্বাভাবিক নয় যখন জাতি বলতে বাধ্য হবে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, “ ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ / চায় দু’টো ভাত একটু নুন / বেলা বয়ে যায় খায়নিক বাছা / কচি পেটে তার জলে আগুন।”
মহানবী হযরত, মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইছি ওয়াসাল্লাম বলেছে, “ শিশুরা হচ্ছে আল্লাহর ফুল।” এ ফুলের জন্ম যেখানেই হোক, যে পরিবেশেই এরা বেড়ে উঠুক না কেন, এদের সঙ্গে আমাদের আচার-আচরণ, ব্যবহার মমতাময়ও নরম হওয়া উচিত। ধন নয় মান নয় স্বরাজ নয় ওরা চায় দু’টো ভাতের সঙ্গে একটু নুন। যে দেশে নূন আনতে পান্তা-ভাত ফুরায়, খেয়ে পরে বেঁচে থাকার সঙ্গতি নেই যাদের, “আ-মরি বাঙলা ভাষা’র কথা ভেবে তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার সময় কোথায়?
এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, বাঙালির একটা দিক আছে চিরন্তনতার দিক। মানুষের আবেগ, অনুভূতি, কল্পনা, ভাবনা, সমাজ বা পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক। এসবের মধ্যে যে চিরন্তন ও মৌল অভিজ্ঞতা তা প্রাচীনকালে যেমন ছিলো, তা এখনও আছে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। “স্মৃতি সততই সুখের”। স্মৃতি কাতরতা ঘুরে ঘুরে আসে, কিন্তু কালের প্রলেপে আবেগ বাস্তবতার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। নিজ ঘরে পরবাসী হয়ে যাওয়া মানুষেরাই কি তবে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে সেই-স্মৃতি, মনের কোণে লুকিয়ে থাকলেও, কখনো যা লুপ্ত হয়ে যায়নি। পৃথিবীর নানান জাতির মানুষদের “আন্তর্জাতিক-মাতৃভাষা দিবস” পালনের সঙ্গে বাঙালির এ দিবস পালনের আবশ্যই গুণগত পার্থক্য রয়েছে। শুধু বাংলাদেশের বাঙালি নয়, বাঙালি যে দেশ বা রাষ্ট্রেরই নাগরিক হোক, একই ভাষা মায়ের সন্তান রূপে তাঁদের সকলের সত্তা এক সূত্রে বাঁধা।পৃথিবীর যে দেশে যত বাঙালি আছেন— জাতিগত পরিচয়ে হোক বা নাগরিকত্বের বিচারে— তাঁরা বাংলাদেশীয় ‘বাঙাল’ কিংবা পশ্চিমবঙ্গীয় ‘ঘটিবাঙাল’, এই বিভাজন অতিক্রম করে এখন থেকে সকলেই বিশ্ব-বাঙালি।”
নিশ্চিতভাবে বলা আবশ্যক যে, প্রধানত, ভাষার প্রশ্নেই ১৯৪৮ সালে বোঝা গেলো যে, ১২০০ মাইলের ব্যবধানে পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান অর্থাৎ দু’টি অংশের জনগণের একত্রে বসবাস করা আর সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের পর যে প্রজন্মের জন্ম, তাঁদের পক্ষে কল্পনা করাই কষ্টকর কী অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে এগিয়ে যেতে হয়েছিল। স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের জন্য আমাদের যুদ্ধতো শুরু হয়েছিলো পাকিস্তান সৃষ্টির কিছু পর থেকেই। পদে পদে আন্দোলন সংগ্রাম করে আমরা মাতৃভাষার অধিকার লাভ করেছি।
এখানে দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, মহান আল্লাহ্পাকের ইচ্ছায় একটা জাতি যখন জেগে ওঠে, তখন পৃথিবীর এমন কোন শক্তি নেই যে, তাকে দমিয়ে রাখে। ইতিহাসের যত পেছনে তাকানো যাবে, তত স্পষ্ট দেখা যাবে ভবিষ্যৎকে। কথাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালীন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিলের।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বাঙালির মাতৃভাষার দিকে মুখ ফেরানোর কথা বললে অনেকেই অতীত মুখীবলে উপহাস, ঠাট্টা, ব্যঙ্গ করেন। কিন্তু অতীত না থাকলে আমাদের বর্তমানের মূল্য কোথায়? সমৃদ্ধ অতীতই সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। উদাহরণ দেওয়ার মাধ্যমে আমি একতা বুঝাতে চাই না যে, সকল বাঙালিই এমন।
এখানে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়ের উল্লেখ না করে পারছি না, আমাদের দেশ যতক্ষুদ্রই হোক, বর্তমানে গ্লোবালাইজেশনের যুগে সে অন্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে পারে না। সে কারণে বাংলাদেশকে সর্বক্ষেত্রে বিশ্বের ক্ষুদ্রও বৃহৎ সকল দেশের সঙ্গে পাল্লাদিয়ে চলতে হচ্ছে। এই জন্যে এখন সরকারের অনুমোদন পেয়ে বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। তবে টাকার প্রভাবকে ছোট করে দেখা যায় না। প্রাইভেট স্কুলের প্রতিষ্ঠা তারাতো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে পারবেন না। স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজে বিনিয়োগ করতে ঝুঁকি নিতে হয়।
এখানে পক্ষান্তরে বলা প্রয়োজন যে, ইংরেজি আমাদের মাতৃভাষা নয়; কিন্তু ইংরেজি আমাদের শিখতেই হয়। এতে ক্ষোভের কারণ নেই— বরং লাভই রয়েছে। ইংরেজিতে যাকে ন্যাশনালিজম বলা হয়, তার একটি বড় অংশ আমরা ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমেই আত্মস্থ করেছি। বর্তমানে এ দেশে বিদ্যাবুদ্ধি ও কর্মকুশলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে ইংরেজিতে কথা বলা ও লেখার দক্ষতা। বাংলাদেশের গণমাধ্যম নানা আচার-ব্যবহার ও উপস্থাপনায় যথেষ্ট উন্নত মানের পরিচয় দিচ্ছে। তাই গণমাধ্যমের উচিত জনগণকে ইংরেজি শিক্ষা অর্জনে সহায়তা করা। বর্তমান বিশ্বে ইংরেজি শুধু একটি ভাষা নয়— এটি ক্ষমতার প্রবেশপত্র, শক্তির উৎস। এক অর্থে, ইংরেজিই আজ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বাহন।
এরকম আরো অনেক কথায় বুক ভরে আছে আমাদের। কারণ? বাঙালিই বাঙালিকে ফুটতে দেয় নি। বাঙ্গালী ফুল হয়ে ফুটতে ফুটতে ঝরে যায়, বাঙালি বৃক্ষ হয়ে বাড়তে বাড়তে উপড়ে যায়। বাঙালি স্রোতস্বিনী নদী হয়ে শুকিয়ে মরে, বাঙালি গন্তব্যে পৌঁছার আগেই হুট করে বসে পড়ে। বাঙালির নুন আনতে পান্তা-ভাত ফুরোয়। সকালে বাসি ভাতেরও দেখা মেলে না। পেটে ক্ষুধার জ্বালা এক মুঠো ভাত যে জুটবে তার নিশ্চয়তা থাকে না। কখনো মায়ের রুদ্র মূর্তি, ভাত চাইতেই হাতে চেলা কাঠ নিয়ে তেড়ে আসেন। মায়ের এ রুদ্র মূর্তি কিসের প্রকাশ? মা হয় সন্তানের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে পারছেন না। এ যে কি বড় কষ্ট, কি যন্ত্রণা, কি ভীষণ আত্মগ্লানি কিভাবে চেপে রাখবেন মা! ভাত চাইতে মায়ের চোখের কোণ ভিজে ওঠে, মুখে বলতে হয় না। সন্তান বুঝে ফেলে। ক্ষুদার জ্বালা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। মায়ের রাগ স্বামীর উপর, সংসারের উপর, রাষ্ট্রের উপর, এ সমাজের উপর, সন্তানের উপর নয় এই কি জীবন? একেই কি বলে বেঁচে থাকা!
এখানে বর্ণনার সঙ্গে মিল রেখে প্রসঙ্গত বলা যায় যে, মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে লেখা হলেও প্রসঙ্গক্রমে কোন কোন ক্ষেত্রে নিজের চারপাশের জীবন দর্শনের যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে সেই অনুসারেই আজকের বিষয় লিখছি। আমাদের পক্ষে দেশ ও জনগণের উপযোগী সবগুণ গ্রহণ করাই আমাদের মঙ্গল।
আমাদের পূর্বপুরুষরা আহারে- বিহারে-শয়নে পশ্চিমাদের অর্থাৎ ইংরেজদের অন্ধ অনুকরণের চেষ্টা করেননি। মনে রাখা ভালো, ইংরেজরা যে সম্পদ এবং ক্ষমতার ব্যাপারে একচেটিয়া ভোগের তালে ছিলেন, সে বিষয়ে ইয়ংবেঙ্গল অন্যদের তুলনায় বরং বেশি সচেতন ছিলেন। আর তাঁদের পরবর্তী যূগের চিন্তাবীররা ইউরোপের অনেক কিছুই গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। ইউরোপের সভ্যতা বিচিত্র এবং বহুমুখী। বাঙালি তথা ভারতীয় বাঙালি শিক্ষিত সম্প্রদায় সেই বিরাট ভান্ডার থেকে কিছু জিনিষ বেছে নিয়েছেন। ইংরেজনা আমাদের যা কিছু বোঝাতে চেয়েছিল শিশু শিক্ষার সুবোধ বালক গোপালের মতো তাই বাঙ্গালি তথা ভারতীয়রা মেনে নিয়েছেন এর চেয়ে বড় অসত্য আর নেই।
প্রমাণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সাম্য ও সার্বভৌমত্বের আদর্শ বাঙালি সরাসরি ইংরেজ শাসকের কাছ থেকে পায়নি; যদিও ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমেই সেই ধারণাগুলোর সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। এক সময় বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির একাংশ বিশেষত মোঘল-পাঠান ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারীরা— নিজেদের বংশপরিচয় আরব দেশের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে এক নতুন বিভাজনরেখা তৈরি হলো। ইংরেজি-শিক্ষিত ভদ্রলোকের বৈঠকখানায় আর তথাকথিত “ছোটলোক”-এর প্রবেশাধিকার রইল না। ফলে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিও যেন দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ল— একদিকে শিক্ষাহীন, সম্বলহীন, বঞ্চিত মানুষের বৃহৎ অংশ; অন্যদিকে দুধের উপর পাতলা সরের মতো ভেসে থাকা ক্ষুদ্র ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা জনসংখ্যার বিচারে একসময় ছিল মাত্র শতকরা দুই ভাগ; বর্তমানে তা দশ শতাংশে পৌঁছেছে কি না, তাও সন্দেহের বিষয়। হাস্যকর মনে হলেও, বাস্তবতা অনেকাংশে এমনই। তবু মনে রাখতে হবে— শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়েও মানুষের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। এক সময় কোনো তথাকথিত আধুনিক শিক্ষা ছিল না; কিন্তু মানুষ ছিল, জীবন ছিল, সৃজনশীলতা ছিল। সেই অশিক্ষিত বলে বিবেচিত মানুষই ধীরে ধীরে পৃথিবীকে সভ্যতার পথে এগিয়ে দিয়েছে।
অতএব মাতৃভাষা বাংলার প্রশ্নে আমাদের সবার আগে বাংলার মান, মর্যাদা, অস্তিত্ব ও স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। আসুন, আমরা সর্বশক্তি ও প্রজ্ঞা দিয়ে বাংলাকে সজীব ও সমৃদ্ধ করে তুলি। তাহলেই বাংলার অগ্রযাত্রা সত্যিকার অর্থে সাফল্যমণ্ডিত হবে।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট
মিশিগান-আমেরিকা
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

আনহার চৌধুরী :